সংশয় নিরসন
ইমাম আবু হানিফা রাহ. কি সত্যিই মুরজিআ ছিলেন?
আবু আব্দুল্লাহ | August 02 2025 | 93#ভূমিকাঃ মুরজিআ একটি বিভ্রান্ত ও বেদআতি ফেরকার নাম। এরা আবার বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ বক্তব্য হচ্ছে: “পাপাচার ঈমানের জন্য ক্ষতিকর নয়, যেভাবে কুফরি থাকলে নেককাজ কোনো উপকারী নয়।”
আহলেসুন্নাহ ওয়াল-জামাআত সর্বসম্মতিক্রমে এ মতবাদকে ভ্রান্ত ও বেদআত মনে করেন। ইমাম আবু হানিফা রাহ. থেকেও এমন কোনো বক্তব্য নেই। তবে ঈমানের ‘হকিকত’ নিয়ে জুমহুর আয়িম্মা ও আবু হানিফার মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে।
#বিরোধের সূত্রপাতঃ জুমহুরের মতে ঈমান হচ্ছে মুরাক্কা বা যৌগিক। অন্তরের বিশ্বাস-আমল-কর্ম ও মৌখিক স্বীকারোক্তি, তিনের সমন্বিত রূপের নাম ঈমান। আর আবু হানিফার মতে অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস এবং মৌখিক স্বীকারোক্তির নামই ঈমান। কিন্তু আমল ঈমানের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা ঈমানের মুকাম্মিল বা পরিপূরক।
আর এ বিরোধকে আমি লফজি-শাব্দিক বিরোধ মনে করি। বাস্তবিক অর্থে তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধই নেই। কিন্তু যারা এ বিরোধকে হাকিকি বিরোধ মনে করেন এবং আমলকে ঈমানের ‘রুকনে আসলি’ তথা মৌলিক অংশ জ্ঞান করেন, তাদের ওপর বেশকিছু আপত্তি উত্তাপিত হয়। সে আপত্তি, তার জবাব ও পাল্টা জবাবের প্রেক্ষিতে আমরা প্রমাণ করব — এ বিরোধ স্রেফ লফজি।
#আপত্তিঃ ‘আমল’ যদি ঈমানের ‘রুকনে আসলি’ তথা মৌলিক অংশ হয়, তাহলে ভ্রান্ত খারেজি কিংবা মু’তাযিলিদের মাজহাব গ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। কারণ, রুকনের কোনো ফরদ/ন্যূনতম অংশ ছেড়ে দেয়া মানে ব্যক্তি কাফের হওয়া সুনিশ্চিত। অর্থাৎ কেউ মাঝেমধ্যে সালাত পরিহার করলে বা যাকাত না-দিলে কিংবা সিয়াম ভঙ্গ করলে কাফের হয়ে যাওয়ার কথা।
এখন যদি বলেন ‘এ ক্ষেত্রে সে (এসব আমলে কমতি থাকায়) কাফের এবং ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত’, তবে তা হবে খারেজিদের মাজহাব। আর যদি বলেন ‘সে কাফেরও না আবার মুসলিমও না’, (منزلة بين المنزلتين) তাহলে তা হবে মু’তাযিলিদের মাজহাব। আর এ উভয় মাজহাবই আহলে সুন্নাহর নিকট নিকৃষ্ট বেদআত। তাঁরা যুগে যুগে এদের রদ্দ করে এসেছেন।
এ আপত্তি থেকে বাঁচতে জুমহুরের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমল ঈমানের অংশ বলতে ‘জিনসে আমল’ উদ্দেশ্য। অর্থাৎ ব্যক্তি যদি আমল সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে, তবেই সে কাফের হবে, কিছু কমতির ফলে কাফের হবে না। খারেজি আর মু’তাযিলিদের সঙ্গে তাঁদের পার্থক্য এখানেই।
তবে, এ জবাব খুরুজ আর ই’তেযাল থেকে বাঁচাতে পারলেও তা সহিহ ও সরিহ অনেক হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেগুলোতে আমলবিহীন অনেক মানুষ জান্নাতে যাওয়ার কথা বিবৃত হয়েছে। যেমনঃ
১.শাফাআতের প্রসিদ্ধ ও দীর্ঘ হাদিসের শেষাংশে এসেছে,
فَيُخْرِجُ مِنْهَا قَوْمًا لَمْ يَعْمَلُوا خَيْرًا قَطُّ قَدْ عَادُوا حُمَمًا
অতঃপর আল্লাহ জাহান্নাম থেকে এমন একদলকে বের করবেন, যারা কখনোই কোনো আমল করে নাই। আগুনে পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। [সহিহ মুসলিম — ৩৪৩, মুসনাদে আহমদ — ১১৮৯৮]
ইমাম ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন, “হাদিসের ভাষ্য থেকে পরিষ্কার যে, এরা কোনো নেক কাজ করে নাই। স্রেফ আল্লাহর রহমত এদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করবে।” [হাদিল আরওয়াহ — ২/৭৮০]
তবে শাইখ ইবনু উসাইমিন রাহ. উক্ত হাদিসের জবাব দুইভাবে দিতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। তাঁর দুই জবাবের প্রথমটি স্পষ্ট গুঁজামিল আর দ্বিতীয়টি ভুল। #প্রথম_জবাবে তিনি বলেন,
“হাদিসে আমল ছাড়াও জাহান্নাম থেকে বের করা হবে দ্বারা ঐসকল লোকদের বের করা উদ্দেশ্য, যারা জীবনে কোনো নেক কাজ করার সুযোগই পায় নাই। হয়ত ঈমান এনেই বা তাওবা করেই মারা গেছে।”
[ফাতাওয়া আল-আকিদাহ — ৫২৬, মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসাঈল — ২/৪৭-৪৮]
#পাল্টা_জবাবঃ যদি নেক কাজ করার সুযোগ না-পায়, তাহলে এরা জাহান্নামে গেল কীভাবে? আমরা তো হাদিসের ভাষ্য থেকে জানলাম যে, এরা জাহান্নামে পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে যাবে। হাদিসে আরও এসেছে যে, নবিগন, ফেরেশতাগন ও মু’মিনগনের শাফাআত শেষে আল্লাহর বিশেষ রহমতে তাদেরকে বের করা হবে একদম শেষ পর্যায়ে। যদি এরা দুনিয়ায় নেক কাজ করার সুযোগই না-পায়, তাহলে এত এত পাপকাজ করার সুযোগ পেল কীভাবে? এত্থেকে পরিষ্কার যে, ইবনু উসাইমিনের এ জবাব সম্পূর্ণ গুঁজামিল। আর যারা নেক কাজের সুযোগ না-পেরে মারা যাবে, তারা অবশ্যই জান্নাতে যাবে। তারা জাহান্নামে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
#দ্বিতীয়_জবাবে শাইখ বলেন,
“হাদিসটি মুতলক। সুতরাং তা মুকাইয়্যাদের ওপর হামল-প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ, তাওহিদ-রক্ষাকারী সকল আমল যেমন ‘সালাত’ আদায় করতেই হবে। সালাত ত্যাগকারী কাফের। চিরস্থায়ী জাহান্নামি এবং সে শাফাআতের যোগ্য নয়।” [প্রাগুক্ত]
আমার দৃষ্টিতে এ জবাবটিও ভুল। কারণ, মুতলাককে মুকাইয়্যাদ করার কিছু (৭) শর্ত রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই শর্ত —
প্রথম শর্তঃ
“তাকয়িদ (সীমাবদ্ধকরণ) ব্যতীত উভয় দলিলকে জমা-একত্রে গ্রহণ অসম্ভব হওয়া।
যদি উভয় দলিলকে একসঙ্গে আমলে নেয়া সম্ভব হয়, তাহলে উভয়টিকে আমলে নেয়া উত্তম।”
[শাওকানি, ইরশাদুল ফুহুল ইলা তাহকিকিল হাক মিন ইলমিল উসূল — ২/১০]
আমরা দেখি যে, ইবনু উসাইমিনের দাবি এ শর্তকে লঙ্ঘন করছে। কেননা শাফাআতের হাদিস এবং সালাত ত্যাগকারী কাফের হওয়া সংক্রান্ত হাদিসকে একত্রে গ্রহণ করা সম্ভব। কারণ, আহলে সুন্নাহ ওয়াল-জামাআতের নিকট কুফরি হচ্ছে দুই প্রকার।
(১) কুফরে এ’তেকাদি। যে কারণে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়। যেমনঃ কোরআন, আল্লাহ, রাসূল বা ফেরেশতা অস্বীকার করা।
(২) কুফরে আমলি। এটি আবার দুই ধরণের।
★ ঈমান বিধ্বংসী। যেমন নাবি আলাইসিস সালামকে গালি দেয়া, কোরআনকে অবমাননা করা, মূর্তিকে সেজদা করা ইত্যাদি।
★ ঈমান বিধ্বংসী নয়। যেমনঃ যিনা করা, মদপান, চুরি, কাউকে হ ত্যা করা ইত্যাদি। এগুলো ঈমান বিধ্বংসী নয়। নাবি আলাইসিস সালাম তাঁর হাদিসে এসব কাজকে কুফরি আখ্যা দেয়ার কারণে আমরাও এগুলোকে কুফরি বলতে বাধ্য। তবে এসব হচ্ছে কুফরে আমলি, যা রিদ্দাহ বা ঈমান ধ্বংসের কারণ নয়। জাস্ট কবিরাহ গোনাহ। ঠিক একইভাবে আমরা বলি, সালাত ত্যাগ করা কুফরি কাজ। তবে তা সেসব কুফিরির অন্তর্ভুক্ত নয়, যার কারণে ব্যক্তি মুরতাদ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় শর্তঃ
“তাকয়িদ তথা সীমাবদ্ধতা আরোপে বাধা প্রদানকারী কোনো দলিল থাকা যাবে না। যদি এমন কোনো দলিল থাকে, যা তাকয়িকের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে এ তাকয়িদ প্রযোজ্য হবে না।”
[শাওকানি, ইরশাদুল ফুহুল ইলা তাহকিকিল হাক মিন ইলমিল উসূল — ২/১০]
আমরা দেখি যে, ইবনু উসাইমিনের দাবি এ শর্তকেও লঙ্ঘন করছে। কেননা বিভিন্ন হাদিসে সালাত ছাড়াও মানুষ জান্নাতে চলে যাবে বলে বিবৃত হয়েছে। যেমন শাফাআতের মুত্তাফাক আলাইহি বর্ণনায় এসেছে —
(১)
নাবি আলাইসিস সালাম যখন কাকুতিমিনতি করবেন, তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন —
فَيَقُولُ: وَعِزَّتِي وَجَلاَلِي، وَكِبْرِيَائِي وَعَظَمَتِي لَأُخْرِجَنَّ مِنْهَا مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
“আমার ইজ্জত ও পরাক্রম এবং আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের শপথ! যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছে, আমি অবশ্যই অবশ্যই তাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনব।” [বুখারি-৭৫১০, মুসলিম-১৯৩]
এরা হবে সর্বনিম্নস্থরের জান্নাতি, যারা (সালাত, সিায়াম, হজ্জ) কোনো আমলই করে নাই। আর যারা টুকিটাকি আমল করেছিল, নবিগন, ফেরেশতারা আর মুমিনগণ সুপারিশ করে আগেই বের করে নিয়েছেন।
(২)
عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: «يَقُولُ اللهُ: أَخْرِجُوا مِنَ النَّارِ مَنْ ذَكَرَنِي يَوْمًا» أَوْ خَافَنِي فِي مَقَامٍ.
“আনাস রা. থেকে বর্ণন, নাবি আলাইসিস সালাম বলেন — আল্লাহ বলবেন, জাহান্নাম থেকে তাকেও বের করে আনো, যে কোনো একদিন আমাকে স্মরণ করেছে বা কোনো একস্থানে আমাকে ভয় পেয়েছে।”
[তিরমিজি — ২৫৯৪, আস-সুন্নাহ, ইবনু আবি আসিম — ৮৩৩]
(হাদিসটির মান হাসান পর্যায়ের।)
সালাত ছাড়া চিরস্থায়ী জাহান্নামি বলে ইবনু উসাইমিনের যে তাকয়িদ-সীমাবদ্ধকরণের দাবি, তা উপর্যুক্ত দুই হাদিস থেকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। এ সংক্রান্ত আরেকটি হাদিস দেখে নেয়া যাক।
(৩)
عن حذيفة بن اليمان، قال: قال رسول الله — صلى الله عليه وسلم -: “يدرس الإسلام كما يدرس وشي الثوب، حتى لا يدرى ما صيام ولا صلاة ولا نسك ولا صدقة…وتبقى طوائف من الناس، الشيخ الكبير والعجوز، يقولون: أدركنا آباءنا على هذه الكلمة: لا إله إلا الله، فنحن نقولها”.
“হুজায়ফা রা. থেকে বর্ণিত, নাবি আলাইসিস সালাম বলেন — ইসলাম মুছে যাবে যেভাবে কাপড়ের নকশা (ধীরে ধীরে) মুছে যায়। শেষমেশ এমন হবে যে, মানুষ জানবেই না সিয়াম কী সালাত কী, কুরবানি কী, সাদাকাহ কী।… তখন একদল বৃদ্ধ নারী-পুরুষ থাকবে, যারা বলবে: আমরা আমদের পিতৃপুরুষদের এই কালিমা তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’র ওপর পেয়েছি। তাই আমরাও এটিই বলি।
فقال له صلة : ما تغني عنهم لا إله إلا الله، وهم لا يدرون ما صلاة ولا صيام ولا نسك ولا صدقة؟ فأعرض عنه حذيفة، ثم ردها عليه ثلاثا، كل ذلك يعرض عنه حذيفة، ثم أقبل عليه في الثالثة، فقال:يا صلة، تنجيهم من
النار، ثلاثا
তখন তাবেঈ সিলাহ বিন যুফার রাহ. হুজায়ফা রা-কে বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” তাদের কী কজে আসেব, যখন তারা জানবেই না যে, সালাত কী, সিয়াম কী, কুরবানি কী? হুজায়ফা রা. তার উত্তর না-দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সিলাহ তিন বার এ প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি করলেন। হুজায়ফা প্রত্যেকবার তার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন। তৃতীয় বারে তিনি তার দিকে ফিরে বলেন: হে সিলাহ! এই কালিমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দেবে। তিনি কথাটি তিন বার বললেন।”
[ইবনু মাজাহ — ৪০৪৯] (হাদিসের মান: সহিহ)
এত্থেকে পরিষ্কার যে, সালাত ত্যাগ করলে ব্যক্তি কাফের-মুরতাদ হয় না। ফাসেক হয়। অন্তরে ঈমান থাকলে একদিন সে মুক্তি পাবেই। সুতরাং ইবনু উসাইমিন যে তাকয়িদের দাবি করছেন, তা সঠিক নয়।
এখানে কেউ হয়ত বলতে পারেন, এটি আখেরি যামানার সঙ্গে খাস-নির্দিষ্ট। স্বাভাবিক হালতে সালাত ত্যাগ করে মারা গেলে কাফের হয়ে চিরকাল জাহান্নামে থাকা লাগবে।
#আমি_বলব, এ ব্যাখ্যা বর্ণনাকারী সাহাবির বোঝের খেলাফ। কারণ, তাবেঈ সিলাহ বিন যুফার যখন সালাত ছাড়াও মুক্তি পাওয়ার বিষয়ে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, তখন হুজায়ফা রা. বলতে পারতেন, এটি আখেরি যামানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। স্বাভাবিক হালতে ধর্তব্য হবে না। কিন্তু তিনি তিন বার বলেছেন, “এই কালিমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রেহাই দেবে।”
তিনি প্রথম তিন বার উত্তর না-দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারণ এটিই যে, স্রেফ ‘কালিমায়ে তাওহিদ’ মুক্তি দেবে শুনলে মানুষ আমল করতে চাইবে না। অলস হয়ে পড়বে। কালিমার ওপর ভরসা করে বসবে। ভাববে, একদিন তো মুক্তি পাবই। যেমনটা নাবি আলাইসিস সালাম অন্য এক হাদিসেও বলেছেন। মুয়াজ রা. থেকে বর্ণিত। নাবি আলাইসিস সালাম তাঁকে বলেন —
مَا مِنْ عَبْدٍ يَشْهَدُ أَن لاَ إلهَ إلاَّ الله وَأنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ صِدْقاً مِنْ قَلْبِهِ إلاَّ حَرَّمَهُ الله عَلَى النَّار قَالَ : يَا رَسُولَ اللهِ أفَلاَ أُخْبِرُ بِهَا النَّاس فَيَسْتَبْشِرُوا ؟ قَالَ إِذاً يَتَّكِلُوا فأخبر بِهَا مُعاذٌ عَندَ موتِه تَأثُّما.
“যে কোন বান্দা খাঁটি মনে সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ (সত্য) উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সা. তাঁর বান্দা ও তাঁর রসূল, তাকে আল্লাহ তা’আলা দোযখের জন্য হারাম করে দেবেন। মুআজ বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি কি লোকেদেরকে এই খবর বলে দেব না, যেন তারা (শুনে) আনন্দিত হয়? তিনি বললেন, তাহলে তো তারা (এর উপরই) ভরসা করে নেবে (এবং আমল ত্যাগ করে বসবে)। অতঃপর মুআজ (ইলম গোপন রাখার) পাপ থেকে বাঁচার জন্য তাঁর মৃত্যুর সময় (এ হাদীসটি) জানিয়ে দিয়েছিলেন।”
[বুখারী ১২৮, মুসলিম ১৫৭]
আর এ দিক বিবেচনায় জুমহুর আয়িম্মায়ে কেরাম আমলের গুরুত্ব বুঝাতে এবং আমলের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত রাখতে তা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, রুকনে আসলি বা মৌলিক অংশ হিসেবে নয়।
যেমন সালাতের গুরুত্ব বুঝাতে আবুদ-দারদা রা. বলেন —
.لا إيمان لمن لا صلاة له
“যার নামাজ নেই, তার ঈমানই নেই।”
[আস-সুন্নাহ, খাল্লাল — ১৩৮৪]
তার মানে এই না যে, যার সালাত নেই সে কাফের। বরং তিনি রা. সালাতের গুরুত্ব বুঝাতে এমন করে বলেছেন। আর এমন গুরুত্ব বুঝানোর নজির শরিয়তে রয়েছে। যেমনঃ হাদিসে এসেছে —
لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ
“যার মধ্যে আমনতদারি নেই, তার ঈমানই নেই।” [আহমদ — ১২৩৮৩]
لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে। [বুখারি-মুসলিম]
মোহাম্মদ ইবনুল হানাফিয়্যহ রাহ. বলেন —
لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا تَقِيَّةَ لَهُ
যার তাকওয়া নেই, তার ঈমানই নেই।
[মুসান্নাফ ইবনি আবি শাইবা — ৩৩০৪৫]
কিন্তু কেউ-ই এই দাবি করেন না যে, আমানতের খেয়ানত করলে কিংবা অপর মুসলিম ভাই’র জন্য সেরাটা পছন্দ না-করলে অথবা তাকওয়ার কমতি থাকলে ব্যক্তি কাফের-মুরতাদ/চিরস্থায়ী জাহান্নামি হয়ে যাবে। বরং আমানত, মুসলিম ভাই’র কল্যাণকামিতা এবং তাকওয়ার গুরুত্ব বুঝাতে এমন করে বলা হয়েছে।
এ মর্মের হাদিস অগণিত। (আমি পোস্ট আর দীর্ঘ করছি না।) আশা করি সবার নিকট দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট যে, আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করার দ্বারা আমলকে ঈমানের মৌলিক অংশের অন্তর্ভুক্ত করা জুমহুরের উদ্দেশ্য নয়, বরঞ্চ আমলের গুরুত্ব বুঝানো উদ্দেশ্য। আমল ছাড়া ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে না বুঝানো উদ্দেশ্য।
আর এটিই ইমাম আবু হানিফা রাহ-এর অভিমত। কিন্তু পরবর্তী অনেকেই এ শাব্দিক বিরোধকে বাস্তবিক বিরোধ জ্ঞান করার ফলে আবু হানিফাকে মুরজিআ আখ্যা দিয়েছে, যা সুস্পষ্ট জুলম। ইমামুনা ইবনু আবিল ইজ্জ আল-হানাফি রাহ. বলেন —
والاختلاف الذي بين أبي حنيفة والأئمة الباقين من أهل السنة — اختلاف صوري. فإن كون أعمال الجوارح لازمة لإيمان القلب، أو جزءا من الإيمان، مع الاتفاق على أن مرتكب الكبيرة لا يخرج من الإيمان، بل هو في مشيئة الله، إن شاء عذبه، وإن شاء عفا عنه -: نزاع لفظي، لا يترتب عليه فساد اعتقاد.
“ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং আহলে সুন্নাহর অন্যান্য ইমামের মধ্যে মতপার্থক্য আসলে কেবল শব্দগত। কারণ, অন্তরের বিশ্বাসের জন্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আমল (কর্ম) লাযিম-আবশ্যিক হোক বা তা ঈমানের একটি অংশ হোক — এ বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে যে, কোনো কবিরাহ গুনাহকারী ঈমান থেকে বের হয়ে যায় না। বরং সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন: তিনি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দেবেন। আর ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন। অতএব, এ বিতর্ক শুধু ভাষাগত এবং এতে আকিদাহ’র কোনো বিকৃতি সৃষ্টি হয় না।” [শরহুল আকিদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ — ২/৪৬২]
আল্লাহ আমাদের সহিহ সমঝ দান করুন। কারও প্রতি অন্যায়ভাবে জুলম করা থেকে রক্ষা করুন। আমিন
— মোহাম্মদ আব্দুল হক হাফি.
রাসুল (সাঃ) বদদোয়া করেছেন?
December 14 2023
345
বর্তমান সময়ে বিবাহের ক্ষেত্রে মোহরে ফাতেমী কত টাকা?
December 01 2023
292
করযে হাসানা : কিছু নির্দেশনা
December 05 2023
292
কবরে শুয়ে মৃতরা কি শুনতে পায়?
December 11 2023
283
‘এরা এমন এক কালসাপ, যার বিষদাঁত এখনই উপড়ে ফেলা না হলে অন্যান্য মুসলিম ভূখণ্ডেও ছোবল বসাবে’
December 02 2023
253
ফিলিস্তিন সংকট : স্বদেশ ও বিদেশ
December 03 2023
252
কাফের দেশে স্থায়ী বসবাস সম্পর্কে ইসলামের বিধান
December 14 2023
233
গাজায় ইসরাইলের বর্বরতা গাজাবাসীর জন্য দুফোঁটা অশ্রু!
December 01 2023
232
হিজাব-নিকাব হিজাবের মর্যাদা রক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
December 05 2023
222
ঈদের নামায স্থানীয়ভাবে আদায় করবো? না সৌদির সঙ্গে মিলিয়ে?
December 03 2023
215