আমল ও আত্মশুদ্ধি

'গান-বাজনা হারাম' — এই কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন? গান বাদ্যযন্ত্র কি হারাম?
'গান-বাজনা হারাম' — এই কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন? গান বাদ্যযন্ত্র কি হারাম?

নবী (ﷺ ) বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য মদ, জুয়া, ঢোল তবলা এবং বীণা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করেছেন।” [আহমাদ ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৭০৮] “অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।” [সহীহুল জামে’ ৩৬৬৫, ৫৪৬৭] "মদের মূল্য হারাম, ব্যভিচারের উপার্জন হারাম, কুকুরের মূল্য হারাম, তবলা হারাম।" [ত্বাবারানী ১২৪৩৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮০৬] "ঘন্টা বা ঘুঙুর হল শয়তানের বাঁশি।" [মুসলিম ২১১৪, আবূ দাঊদ ২৫৫৬, আহমাদ ২/৩৬৬, ৩৭২, বাইহাকী ৫/২৫৩] রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইহ-পরকালে দুটি শব্দ-ধ্বনি অভিশপ্ত; সুখ ও খুশীর সময় বাঁশীর শব্দ এবং মসীবত, শোক ও কষ্টের সময় হা-হুতাশ ধ্বনি। [বাযযার ৭৫১৩, সহীহুল জামে’ ৩৮০১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪২৭] ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ঢোলক হারাম, বাদ্যযন্ত্র হারাম, তবলা হারাম এবং বাঁশীও হারাম। [বাইহাকী ২০৭৮৯] হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, ঢোলক মুসলিমদের ব্যবহার্য নয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদের সহচরগণ ঢোলক দেখলে ভেঙ্গে ফেলতেন। [দেখুন, তাহরীমু আলাতুত ত্বারব, আলবানী ১০৩-১০৪ পৃঃ] আল্লাহর রাসূল (ﷺ ) অন্যত্র বলেছেন, ''অবশ্যই অবশ্যই আমার উম্মাতের মধ্য হতে এমন কিছু গোষ্ঠি তৈরি হবে, যারা যেনা-ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।'' [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৯০] হাদীসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বাদ্যযন্ত্র হারাম। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘বৈধ মনে করবে’, তার মানে তিনি বুঝিয়েছেন এটা অবৈধ, এরপর লোকেরা একে বৈধ বানিয়েছে। তিনি আরো বলেন, সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী বহু গুনাহর সমষ্টি হল গান ও বাদ্যযন্ত্র। যথা: • ক) নিফাক এর উৎস • খ) ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী • গ) মস্তিষ্কের উপর আবরণ • ঘ) কুরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী • ঙ) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী • চ) গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও • ছ) জিহাদী চেতনা বিনষ্টকারী। [ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭] শাইখুল ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিঃ) বলেন, “যে সকল কাজ শয়তানের পথকে শক্তিশালী করে তাদের মধ্যে গান বাজনা শোনা এবং অন্যায় হাসি তামাশা অন্যতম। এটা সেই কাজ যা কাফেররা করত। তিনি আরো বলেন, গান হচ্ছে অন্তরের মদ।” [মাজমু'ঊ ফাতাওয়া : ১০/৪১৭] গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন- ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে। (কুরতুবী ১৪/৫৫) ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক। তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫) হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। (আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮) ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২ মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়। (ফাতহুল বারী ৯/২২৬) ‘তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।’ (সূরা ইসরা ৬৪) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে সেটাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ (রাহি.) বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহি.) বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯) ইমাম ইবন তাইমিয়া (রাহি.) আরো বলেন সেই ব্যক্তির সম্পর্কে যার স্বভাব হল গান-বাজনা শোনা, ‘সে যখন কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করে তখন সে আবেগাপ্লুত হয় না, অপরদিকে সে যখন শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (গান-বাজনা) শ্রবণ করে, সে নেচে উঠে। যদি সে সালাত প্রতিষ্ঠা করে, তবে সে হয় বসে বসে তা আদায় করে অথবা মুরগী যেভাবে মাটিতে ঠোকর দিয়ে শস্যদানা খায় সেভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে। সে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করতে অপছন্দ করে এবং তাতে কোন সৌন্দর্য খুঁজে পায় না। কুরআনের প্রতি তার কোন রুচি নেই এবং যখন তা পড়া হয় সে এর প্রতি কোন টান বা ভালোবাসা অনুভব করে না। বরং, সে মু’কা (শিষ দেয়া) ও তাসদিয়া (তালি দেয়া) শুনে মজা পায়। এগুলো শয়তানী আনন্দ এবং সে তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই, অতঃপর সে সর্বক্ষণ তার সাথী হয়ে থাকে”। (আউলিয়া আর রাহমান)

April 01 2025

109

আমল ও আত্মশুদ্ধি

“তোমরা মৃতদের গালি দিও না, কেননা তারা অবশ্যই যা আমল করে সামনে পাঠিয়েছে তার কাছে পৌঁছে গেছে” - হাদিসটির ব্যাখ্যা।

একটা হাদিস উল্লেখ করে অনেকেই আমভাবে সকল মৃত সম্পর্কে অপছন্দনীয় কথা বলতে নিষেধ করেন, হাদিসটি হচ্ছে- لاَ تَسُبُّوا الأَمْوَاتَ، فَإِنَّهُمْ قَدْ أَفْضَوْا إِلَى مَا قَدَّمُوا . “তোমরা মৃতদের গালি দিও না, কেননা তারা অবশ্যই যা আমল করে সামনে পাঠিয়েছে তার কাছে পৌঁছে গেছে” . . এটা সহিহ বুখারির ১৩৯৩ নং হাদিস, এখানে أفضی إلی অবগত হওয়া অর্থও নির্দেশ করে।. . যাই হোক এই হাদিসের বাহ্যিক অর্থ এমনিতেও কেবল গালিগালাজ ও লানত করা থেকে নিষেধ করেছে। যাইদ বিন মুনির বা অন্য যারা এ থেকে আম হুকুম নিয়েছেন ইমাম ইবন হাজার(রাহ) ফাতহুল বারিতে তার জবাব দিয়েছেন।. . এই বাবের শুরু থেকে হাদিস পর্যন্ত ইবন হাজার(রাহ) আলোচনা করেছেন, সারমর্ম এই অল্প কথায় এসে যায়-. . وأصح ما قيل في ذلك أن أموات الكفار والفساق يجوز ذكر مساويهم للتحذير منهم والتنفير عنهم وقد أجمع العلماء على جواز جرح المجروحين من الرواة أحياء وأمواتا . . “সর্বাধিক সঠিক মত হচ্ছে এটা যা বলা হয় যে কাফির ও ফাসিকদের দোষত্রুটিসমূহ (খারাপ দিকসমূহ) তাদের থেকে সতর্ক করতে ও তাদের থেকে (অন্যদের) তাড়ানোর জন্য উল্লেখ করা জায়েয। আলিমগণ একমত যে ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনাকারীদের জার্হ করা জায়েয, তা সে জীবিত হোক বা মৃত”- ফাতহুল বারী: ৩/২৫৯ , অনুরূপ আলোচনা ইমাম আইনীও(রাহ.) করেছেন।. . যাই হোক, আজকাল জালিম তো দূর কি বাত দেখছি আহলে বিদ’আহ মারা যাবার পরও অনেকে শোক প্রকাশ করছেন। ওকে, এটা আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ বিষয়ে আমার বলবার কিছু নাই। তবে আমি সালাফের কিছু ঘটনা উল্লেখ করব যা অন্যদের প্রেরণা দেবে-. . 1) ইমাম আবু বকর আল খাল্লাল(রাহ.) বলেন- قيل لأبي عبد الله — أي : الإمام أحمد بن حنبل — : الرجل يفرح بما ينزل بأصحاب ابن أبي دؤاد ، عليه في ذلك إثم ؟ قال : ومن لا يفرح بهذا ؟ . . “আবু আব্দিল্লাহ অর্থাৎ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল(রাহ.) কে বলা হল ইবন আবি দুওয়াদের সংগীদের ওপর যে মুসিবত এসেছে তা জেনে লোকেরা আনন্দিত হচ্ছে। এতে কি তাদের গুনাহ হচ্ছে? তিনি বললেন, এতে কে আনন্দিত হবে না?”- আস সুন্নাহ্: ৫/১২১. . ইবন আবি দুওয়াদ ছিল মু’তাযিলাদের ইমাম। যে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়। . . ২) বাগদাদের আমীরদের একজন ছিল আল হাসান বিন সাফী আত তুর্কি। সে ছিল রাফিযী, শী’আ। তাঁর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে ইমাম ইবন কাসির(রাহ.) বলেন-. . فلله الحمد والمنَّة . وحين مات فرح أهل السنة بموته فرحاً شديداً ، وأظهروا الشكر لله ، فلا تجد أحداً منهم إلا يحمد الله . . “আল্লাহইর প্রশংসা ও অনুগ্রহ (যে এ মারা গেছে)। সে যখন মারা যায় তখন আহলে সুন্নাহ অত্যন্ত আনন্দিত হয়। আর আল্লাহর শুকরিয়া খুল্লামখুল্লা প্রকাশ করে, তুমি তাদের এমন একজনকেও পাবে না যে আল্লাহর প্রশংসা করে নি”-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১২/৩৩৮. . আজকাল আহলে সুন্নাহ বদলে গেছে।. . 3) ইমাম আবু হানিফা(রাহ.) হাম্মাদ(রাহ) হতে বর্ণনা করেন-. . بشرت ابراهيم النخعي بموت الحجاج فسجد ورايته يبكي. . “ইব্রাহীম আন নাখাঈ(রাহ.) কে হাজ্জাজের মৃত্যুর সুসংবাদ দেয়া হল, তিনি তখনই সিজদায় পড়ে গেলেন, আর আমি তাঁকে (সিজদায়) কাঁদতে দেখলাম”-তবাকাতু ইবন সা’দ: ৬/২৮০ . . এগুলোই যথেষ্ট ইন শা আল্লাহ। - উস্তাদ মানযুরুল কারীম (হাফিঃ)

December 14 2023

121

আমল ও আত্মশুদ্ধি

হিজাব-নিকাব হিজাবের মর্যাদা রক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হিজাব-নিকাব আমাদের কাছে অতি পরিচিত দুটি শব্দ। শব্দদুটি মূলত আরবী শব্দ হলেও তা আমাদের ভাষার শব্দভাণ্ডারে পাকাপোক্ত স্থান করে নিয়েছে। এর স্থান বাংলাভাষী মুসলিমদের অন্তরের গভীরে। হিজাব-নিকাব স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন ইসলামী সংস্কৃতির অংশ। মুসলিম নারীর মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতিক। যুগ যুগ ধরে চলে আসা উম্মাহর মহীয়সী নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। সর্বোপরি তা কুরআন-সুন্নাহর পর্দার বিধান পালনের উত্তম উপায়। এসব কারণে মুসলিম-মানসে হিজাব-নিকাবের স্থান অত্যন্ত গভীরে। এটি একটি পোশাকমাত্র না, এর সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিম নারী-পুরুষের ধর্মীয় আবেগ, মহান আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের পবিত্র প্রেরণা, উন্নত ও নির্মল ঐতিহ্যের অনুসরণ, সংযম, সচ্চরিত্র ও লজ্জাশীলতার মতো উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অনুশীলন। এইসব জিনিসের গুরুত্ব উপলব্ধি করার মতো জ্ঞানগত ও চিন্তাগত যোগ্যতা যাদের আছে, তারা হিজাব-নিকাবের গুরুত্বও উপলব্ধি করতে পারবেন।

December 05 2023

222

আমল ও আত্মশুদ্ধি