আমল ও আত্মশুদ্ধি

'গান-বাজনা হারাম' — এই কথা আপনি কোথায় পেয়েছেন? গান বাদ্যযন্ত্র কি হারাম?

আবু আব্দুল্লাহ | April 01 2025 | 110

গান-বাজনা - অর্থাৎ বাদ্যযন্ত্র থাকলে ঐ গান বাজনা হারাম, গানের কথা যতই ভাল বা ইসলামিক হোক না কেন! 

নবী (ﷺ ) বলেন, “অবশ্যই আল্লাহ আমার উম্মতের জন্য মদ, জুয়া, ঢোল তবলা এবং বীণা-জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করেছেন।” [আহমাদ ৬৫৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৭০৮]

“অবশ্যই আমার উম্মতের মাঝে (কিছু লোককে) মাটি ধসিয়ে, পাথর বর্ষণ করে এবং আকার বিকৃত করে (ধ্বংস করা) হবে। আর এ শাস্তি তখন আসবে, যখন তারা মদ পান করবে, নর্তকী রাখবে এবং বাদ্যযন্ত্র বাজাবে।” [সহীহুল জামে’ ৩৬৬৫, ৫৪৬৭]

"মদের মূল্য হারাম, ব্যভিচারের উপার্জন হারাম, কুকুরের মূল্য হারাম, তবলা হারাম।" [ত্বাবারানী ১২৪৩৫, সিলসিলাহ সহীহাহ ১৮০৬]

"ঘন্টা বা ঘুঙুর হল শয়তানের বাঁশি।" [মুসলিম ২১১৪, আবূ দাঊদ ২৫৫৬, আহমাদ ২/৩৬৬, ৩৭২, বাইহাকী ৫/২৫৩]

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ইহ-পরকালে দুটি শব্দ-ধ্বনি অভিশপ্ত; সুখ ও খুশীর সময় বাঁশীর শব্দ এবং মসীবত, শোক ও কষ্টের সময় হা-হুতাশ ধ্বনি। [বাযযার ৭৫১৩, সহীহুল জামে’ ৩৮০১, সিলসিলাহ সহীহাহ ৪২৭]

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, ঢোলক হারাম, বাদ্যযন্ত্র হারাম, তবলা হারাম এবং বাঁশীও হারাম। [বাইহাকী ২০৭৮৯]

হাসান বাসরী (রঃ) বলেন, ঢোলক মুসলিমদের ব্যবহার্য নয়। আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদের সহচরগণ ঢোলক দেখলে ভেঙ্গে ফেলতেন। [দেখুন, তাহরীমু আলাতুত ত্বারব, আলবানী ১০৩-১০৪ পৃঃ]

আল্লাহর রাসূল (ﷺ ) অন্যত্র বলেছেন, ''অবশ্যই অবশ্যই আমার উম্মাতের মধ্য হতে এমন কিছু গোষ্ঠি তৈরি হবে, যারা যেনা-ব্যভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।'' [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫৫৯০]

হাদীসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বাদ্যযন্ত্র হারাম। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘বৈধ মনে করবে’, তার মানে তিনি বুঝিয়েছেন এটা অবৈধ, এরপর লোকেরা একে বৈধ বানিয়েছে। তিনি আরো বলেন, সাহাবী ও তাবেয়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী বহু গুনাহর সমষ্টি হল গান ও বাদ্যযন্ত্র। যথা:

• ক) নিফাক এর উৎস

• খ) ব্যভিচারের প্রেরণা জাগ্রতকারী

• গ) মস্তিষ্কের উপর আবরণ

• ঘ) কুরআনের প্রতি অনিহা সৃষ্টিকারী

• ঙ) আখিরাতের চিন্তা নির্মূলকারী

• চ) গুনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টিকারী ও

• ছ) জিহাদী চেতনা বিনষ্টকারী।

[ইগাছাতুল লাহফান ১/১৮৭]

শাইখুল ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিঃ) বলেন,

“যে সকল কাজ শয়তানের পথকে শক্তিশালী করে তাদের মধ্যে গান বাজনা শোনা এবং অন্যায় হাসি তামাশা অন্যতম। এটা সেই কাজ যা কাফেররা করত। তিনি আরো বলেন, গান হচ্ছে অন্তরের মদ।” [মাজমু'ঊ ফাতাওয়া : ১০/৪১৭]

গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.-অভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সকলেই গান-বাদ্যকে হারাম বলে আখ্যায়িত করেছেন-

ইমাম মালেক রাহ. কে গান-বাদ্যের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কেবল ফাসিকরাই তা করতে পারে। (কুরতুবী ১৪/৫৫)

ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন যে, গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হল আহমক।

তিনি আরো বলেন, সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৭৯; কুরতুবী ১৪/৫৫)

হাম্বলী মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ আল্লামা আলী মারদভী লেখেন, বাদ্য ছাড়া গান মাকরূহে তাহরীমী। আর যদি বাদ্য থাকে তবে তা হারাম। (আহসানুল ফাতাওয়া ৮/৩৮৮)

ইমাম শাফেয়ী রাহ. শর্তসাপেক্ষে শুধু ওলীমা অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশ আছে বলে মত দিয়েছেন। কেননা বিয়ের ঘোষণার উদ্দেশ্যে ওলীমার অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অবকাশের বর্ণনা হাদীসে রয়েছে।-জামে তিরমিযী হাদীস : ১০৮৯; সহীহ বুখারী হাদীস : ৫১৪৭, ৫১৬২ মনে রাখতে হবে, এখানে দফ বাজানোর উদ্দেশ্য হল বিবাহের ঘোষণা, অন্য কিছু নয়। (ফাতহুল বারী ৯/২২৬)

‘তোর আওয়াজ দ্বারা তাদের মধ্য থেকে যাকে পারিস পদস্খলিত কর।’ (সূরা ইসরা ৬৪)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে সকল বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে সেটাই ইবলিসের আওয়াজ। বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ (রাহি.) বলেন, ইবলিসের আওয়াজ বলতে এখানে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহি.) বলেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব বস্তু পাপাচারের দিকে আহ্বান করে তার মধ্যে গান-বাদ্যই সেরা। এজন্যই একে ইবলিসের আওয়াজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (ইগাছাতুল লাহফান ১/১৯৯)

ইমাম ইবন তাইমিয়া (রাহি.) আরো বলেন সেই ব্যক্তির সম্পর্কে যার স্বভাব হল গান-বাজনা শোনা, ‘সে যখন কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করে তখন সে আবেগাপ্লুত হয় না, অপরদিকে সে যখন শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (গান-বাজনা) শ্রবণ করে, সে নেচে উঠে। যদি সে সালাত প্রতিষ্ঠা করে, তবে সে হয় বসে বসে তা আদায় করে অথবা মুরগী যেভাবে মাটিতে ঠোকর দিয়ে শস্যদানা খায় সেভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে।

সে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করতে অপছন্দ করে এবং তাতে কোন সৌন্দর্য খুঁজে পায় না। কুরআনের প্রতি তার কোন রুচি নেই এবং যখন তা পড়া হয় সে এর প্রতি কোন টান বা ভালোবাসা অনুভব করে না। বরং, সে মু’কা (শিষ দেয়া) ও তাসদিয়া (তালি দেয়া) শুনে মজা পায়। এগুলো শয়তানী আনন্দ এবং সে তাদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই, অতঃপর সে সর্বক্ষণ তার সাথী হয়ে থাকে”। (আউলিয়া আর রাহমান)